ভারত এখন ডিজিটাল রেভলিউশনের পথে এগোচ্ছে। দিনের পর দিন ভারতের সমস্ত কিছু ডিজিটালাইজ হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক থেকে রেল টিকিট, বিদ্যুতের বিল থেকে গ্যাস বুকিং—সব কিছুই এখন অনলাইনে সম্ভব। সমস্ত কিছু এখন বাড়িতে বসেই করা যাচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে। সেই ধারাবাহিকতায় রাস্তায় গাড়ি চালানোর অন্যতম আবশ্যক নথি ড্রাইভিং লাইসেন্স (Driving Licence)-ও এখন একেবারে ঘরে বসেই বানানো সম্ভব। আপনার যদি এখনো ড্রাইভিং লাইসেন্স না থেকে থাকে বা আপনার বয়স যদি ১৮ বছর হয়ে থাকে তাহলে আপনি বাড়িতে বসেই বানাতে পারবেন ড্রাইভিং লাইসেন্স। একসময় লাইসেন্স করতে হলে দিনের পর দিন RTO অফিসে লাইনে দাঁড়াতে হতো, দালালদের হাতে টাকা খরচ করতে হতো, আর সময় নষ্ট হতো অগণিত। কিন্তু ২০২৫ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী এখন আর সেই ঝামেলা নেই। খুব সহজেই বাড়িতে বসে বানানোর সম্ভব ড্রাইভিং লাইসেন্স। কয়েকটি সহজ ধাপ মেনে অনলাইনে আবেদন করলেই হাতে চলে আসবে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ড্রাইভিং লাইসেন্স?

ড্রাইভিং লাইসেন্স শুধুমাত্র একটি অনুমতিপত্র নয়, বরং এটি নাগরিকদের জন্য একটি সরকারি স্বীকৃত পরিচয়পত্র। আপনার আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড থাকলে যেমন পরিচয় পত্র হিসেবে কাজে লাগে ঠিক তেমনি ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেও আপনি পরিচয় পত্র হিসেবে এটি ব্যবহার করতে পারবেন। রাস্তায় গাড়ি বা বাইক চালাতে হলে এটি আইনত বাধ্যতামূলক। এছাড়াও আপনি যদি রাস্তায় বাইক বা গাড়ি নিয়ে বের হন তাহলে আপনার বৈধ লাইসেন্স না থাকলে জরিমানা লাগতে পারে। ২০১৯ সালের মোটর ভেহিকলস অ্যাক্ট অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে ধরা পড়লে এখন মোটা অঙ্কের জরিমানা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে জেল পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়াও—

  • ড্রাইভিং লাইসেন্স ভারতের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় পত্র।
  • ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া বিমা ক্লেইমও কার্যকর হয় না।
  • বিভিন্ন সরকারি স্কিম বা ভ্রমণে এটি এক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে কাজ করে।

তাই আইন মেনে চলা এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক ড্রাইভারের জন্য লাইসেন্স অপরিহার্য। তাই এখনো যদি আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স না থেকে থাকে তাহলে খুব সহজেই এখন বাড়িতে বসেই বানাতে পারবেন ড্রাইভিং লাইসেন্স।

২০২৫ সালের নতুন নিয়মে কী বদলালো?

২০২৫ সালের আপডেটেড নিয়মে ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরির প্রক্রিয়া আরও সহজ এবং ডিজিটাল হয়েছে। এর ফলে আর আপনাকে ঘোরাঘুরি করতে হবে না বা সময় নষ্ট করতে হবে না এখন খুব সহজে বাড়িতে বসে সমস্ত কিছু করা যাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স বানানোর জন্য। আগে যেসব ধাপে ঘুরপাক খেতে হতো, এখন সেগুলি এক ক্লিকেই করা সম্ভব।

  • DigiLocker এবং mParivahan অ্যাপের মাধ্যমে লাইসেন্স এখন ডিজিটালি বহনযোগ্য। ফলে হারানোর ভয় নেই। এর ফলে আর আপনাকে ফিজিক্যালি সব জায়গায় ড্রাইভিং লাইসেন্স হাতে করে নিয়ে যেতে হবে না আপনার মোবাইলে থাকলেই চলবে।
  • অনলাইন পরীক্ষা (Learner’s Test) অনেক রাজ্যে বাড়িতে বসেই দেওয়া সম্ভব, যদি আধার কার্ড লিঙ্ক থাকে। এক্ষেত্রেও আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্সকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
  • লাইসেন্সের জন্য বয়সসীমা, মেডিক্যাল টেস্ট, বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন আরও কড়া হয়েছে। এছাড়া ও ড্রাইভিং লাইসেন্সে ব্লাড গ্রুপ লেখা থাকে তাই মেডিকেল টেস্ট বা অন্যান্য মেডিক্লেম করতে ড্রাইভিং লাইসেন্স গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে।
  • কমার্শিয়াল লাইসেন্সের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাধ্যতামূলক।
  • সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য রিনিউয়াল প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। এর ফলে ড্রাইভিং লাইসেন্স রিনিউয়াল করতে আর কোন ঝামেলা রইল না খুব সহজেই রিনিউয়াল করা যাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স।

লাইসেন্সের ধরণ

১. লার্নার লাইসেন্স (Learner’s Licence): নতুন চালকদের জন্য ৬ মাসের অস্থায়ী লাইসেন্স। আপনি ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করলেই এই লার্নার লাইসেন্স পেয়ে যাবেন যা নিয়ে আপনি খুব সহজেই বাইক বা গাড়ি চালাতে পারবেন।
২. স্থায়ী লাইসেন্স (Permanent Licence): সফলভাবে ড্রাইভিং টেস্ট পাস করার পর ইস্যু হয়। এক্ষেত্রে আপনাকে ড্রাইভিং টেস্ট দিয়ে স্থায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হয়।
৩. কমার্শিয়াল লাইসেন্স: ট্রাক, বাস, ট্যাক্সি ইত্যাদি পেশাদার গাড়ির জন্য কমার্শিয়াল লাইসেন্স প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে কমার্শিয়াল লাইসেন্স পেতে গেলেও আগের তুলনায় অনেক সহজেই এখন পাওয়া যাচ্ছে।
৪. আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট (IDP): বিদেশে গাড়ি চালাতে কাজে লাগে বিশেষ করে যারা হেভি গাড়ি চালান তাদের জন্য এই লাইসেন্স প্রয়োজন এবং এটিও আগের তুলনায় অনেক সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স বানানোর প্রক্রিয়া

১. ভিজিট করুন অফিসিয়াল পোর্টাল parivahan.gov.in। এখান থেকেই আপনি অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন বা আবেদন জানাতে পারবেন।
২. আপনার রাজ্য নির্বাচন করুন এবং Learner’s Licence-এর জন্য আবেদন করুন। আপনি এখানে লাইসেন্সের জন্য আবেদন জানাতে পারেন।
৩. আবেদন জানানোর সময় আপনার প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য যেমন নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য পূরণ করুন।
৪. এরপর বেশ কিছু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস (আধার, জন্মসনদ, ঠিকানার প্রমাণ, ফটো) আপলোড করুন।
৫. নির্দিষ্ট ফি অনলাইনে জমা দিন।
৬. অনলাইন টেস্ট দিন বা স্লট বুক করে RTO অফিসে টেস্ট দিন। এক্ষেত্রে আপনি বাড়িতে বসেও টেস্ট দিতে পারবেন।

অর্থাৎ এখানে আবেদন করার জন্য আপনাকে RTO অফিস যেতে হবে না বাড়িতে বসে খুব সহজেই আপনি নিজে নিজে আবেদন জানাতে পারবেন।

প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস

ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন জানাতে হলে আপনার প্রয়োজনীয় বেশ কিছু ডকুমেন্টস থাকতে হবে-

  • আধার কার্ড বাধ্যতামূলক থাকতেই হবে
  • জন্মতারিখের প্রমাণ (Birth Certificate / স্কুল সার্টিফিকেট) বা এক্ষেত্রেও আধার কার্ড ব্যবহার করা যাবে
  • স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ (ভোটার আইডি / বিদ্যুৎ বিল)
  • আবেদনকারী নিজস্ব পাসপোর্ট সাইজ ফটো
  • আবেদন ফি জমার রসিদ

আধার কার্ড থাকলে সুবিধা

আধার কার্ড যুক্ত থাকলে আবেদন প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়। এক্ষেত্রে আপনার আধার কার্ড যদি মোবাইল নাম্বারের সঙ্গে লিংক থাকে তাহলে খুব দ্রুত এবং খুব তাড়াতাড়ি আপনি আবেদন জানিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে পারেন। অনলাইন টেস্ট দেওয়া শেষ হলেই সঙ্গে সঙ্গে ই-লার্নার লাইসেন্স পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে বাড়িতে বসেই আপনি টেস্ট দিতে পারবেন। এর ফলে আবেদনকারী তৎক্ষণাৎ বৈধভাবে রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারেন (অবশ্যই “L” চিহ্ন লাগানো অবস্থায়)।

স্থায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার নিয়ম

লার্নার লাইসেন্স পাওয়ার কমপক্ষে ৩০ দিন পর আবেদনকারী RTO অফিসে ড্রাইভিং টেস্ট দিতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনাকে ৬ মাস টাইম দেওয়া হয় এবং এই ছয় মাসের মধ্যে যেকোনো সময় আপনি স্লট বুকিং করে টেস্ট দিতে পারেন। গাড়ি চালানোর প্র্যাকটিক্যাল টেস্টে পাশ করলেই ইস্যু হবে স্থায়ী লাইসেন্স। এক্ষেত্রে খুব সহজেই ড্রাইভিং টেস্ট পাশ করা যায় এজন্য আপনাকে কিছুদিন গাড়ি চালানোর প্র্যাকটিস করতে হয়। এই টেস্টে সাধারণত দেখা হয়—

  • আপনি সঠিকভাবে ক্লাচ, ব্রেক, গিয়ার ব্যবহার করতে পারছেন কিনা
  • চার চাকার ক্ষেত্রে ব্যাক গিয়ার ও U-turn সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছেন কিনা
  • সঠিক ট্রাফিক নিয়ম এবং ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলা এসব দেখা হয়।

 

২০২৫ সালের জরিমানার হার

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে জরিমানা এখন আরও বাড়ানো হয়েছে—

অপরাধ জরিমানা (₹)
লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো 5000
অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার 10,000
মিথ্যা তথ্য দিয়ে লাইসেন্স বানানো 10,000 + জেল

বিশেষভাবে সক্ষম ও সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য সুবিধা

যারা বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি তারাও এবার ড্রাইভিং লাইসেন্স বানাতে পারবেন এক্ষেত্রে তাদের বেশ কয়েকটি টেস্টে পাস করতে হবে-

  • হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বা বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য আলাদা টেস্ট ব্যবস্থা রয়েছে।
  • সিনিয়র সিটিজেনদের রিনিউয়াল প্রক্রিয়ায় মেডিক্যাল সার্টিফিকেট জমা দিতে হয়, তবে এখন অনেক রাজ্যে অনলাইন ভেরিফিকেশন চালু হয়েছে।

ফি-স্ট্রাকচার (২০২৫)

ধরণ ফি (₹)
লার্নার লাইসেন্স 200
স্থায়ী ড্রাইভিং টেস্ট 300
কমার্শিয়াল লাইসেন্স 750
আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট 1000
রিনিউয়াল 200

হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত লাইসেন্স পুনরায় পাওয়ার উপায়

যদি লাইসেন্স হারিয়ে যায়, তবে DigiLocker বা mParivahan অ্যাপে লগইন করে ডাউনলোড করা সম্ভব। এছাড়া RTO-তে আবেদন করে ডুপ্লিকেট লাইসেন্স নেওয়া যায়। তাই আপনার লাইসেন্স যদি হারিয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সেটিও আপনি খুব সহজেই পেয়ে যেতে পারেন।

পরিবহণ মন্ত্রকের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে AI-ভিত্তিক ড্রাইভিং টেস্ট সিস্টেম চালু হবে, যেখানে ক্যামেরা ও সেন্সরের মাধ্যমে গাড়ি চালানোর দক্ষতা মাপা হবে। তাই এখানে ড্রাইভিং টেস্ট আরো সূক্ষ্ম ভাবে হতে পারে। এছাড়াও পুরো প্রক্রিয়াটাই ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে সুরক্ষিত করা হবে, যাতে কোনও জালিয়াতি না হয়।

তাই এখনো যদি কোন ব্যক্তি ড্রাইভিং লাইসেন্স বানিয়ে না থাকেন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স বানাতে চান তাহলে খুব সহজেই এখন বাড়িতে বসে ড্রাইভিং লাইসেন্স বানানো সম্ভব। নতুন করে এখন ড্রাইভিং লাইসেন্স অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে বানানো খুবই সহজ।