পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ শ্রেণীর (General Category) নাগরিকদের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলির একটি হল EWS সার্টিফিকেট। আপনার যদি EWS সার্টিফিকেট থেকে থাকে তাহলে বর্তমান দিনে সরকারি চাকরি পাওয়া আপনার পক্ষে খুবই সহজ ব্যাপার। পশ্চিমবঙ্গে EWS চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা খুবই কম। তাই যাদের এ ডাবল এ সার্টিফিকেট রয়েছে দেখা যাচ্ছে সরকারি বিভিন্ন চাকরির ক্ষেত্রে তারা অনেক বেশি সংরক্ষণ পাচ্ছেন। সরকারি চাকরি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি অথবা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে ১০% সংরক্ষণের সুবিধা পেতে হলে এই সার্টিফিকেট থাকা বাধ্যতামূলক। আগে এটি পেতে অনেক সময় অপেক্ষা, লাইনে দাঁড়ানো ও কাগজপত্র জমা দেওয়ার ঝামেলা থাকলেও, এখন সম্পূর্ণ ব্যবস্থা ডিজিটাল হওয়ায় সবকিছু অনেক সহজ। সমস্ত ক্যাটাগরির কাটপের তুলনায় EWS এর কাট অফ সবথেকে কম আসছে।

২০২৩ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পূর্ণ অনলাইনে EWS সার্টিফিকেট আবেদন প্রক্রিয়া চালু করেছে, যার ফলে আবেদন, নথি আপলোড এবং স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং— সবই এখন ঘরে বসেই করা সম্ভব। যারা যারা জেনারেল ক্যাটাগরির চাকরিপ্রার্থী তারা সকলেই এই সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। নতুন এই ডিজিটাল পরিষেবা সাধারণ মানুষের সময়, পরিশ্রম এবং খরচ তিনটিকেই কমিয়ে এনেছে। তাই আপনি যদি এই সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন জানাতে চান তাহলে অবশ্যই আপনি বাড়িতে বসে অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন জানাতে পারবেন।

এই প্রতিবেদনে অনলাইনে EWS সার্টিফিকেট পেতে প্রয়োজনীয় সকল নিয়ম, যোগ্যতার শর্ত, ডকুমেন্ট, আবেদন পদ্ধতি এবং সার্টিফিকেট পাওয়ার সম্পূর্ণ আপডেটেড নির্দেশিকা তুলে ধরা হল।

EWS সার্টিফিকেট কী এবং কেন এটি দরকার?

EWS বা Economically Weaker Section হলো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সাধারণ শ্রেণীর নাগরিকদের জন্য কেন্দ্র সরকারের একটি বিশেষ সংরক্ষণ নীতি। ২০১৯ সালে ভারত সরকার শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে সাধারণ ক্যাটাগরির অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রার্থীদের জন্য ১০% সংরক্ষণ চালু করে। এই সুবিধা পেতে হলে EWS সার্টিফিকেট অবশ্যই প্রয়োজন।

এর গুরুত্ব বাড়ছে কারণ— সরকারি চাকরির সব নিয়োগেই এখন EWS কোটা রয়েছে এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় আসন সংরক্ষণ রয়েছে। সমস্ত ধরনের সরকারি চাকরি যেমন UPSC, WBCS, SSC, Railway, Police—প্রায় সব প্রতিযোগিতায় বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্কলারশিপ ও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন এই সার্টিফিকেট থাকলে। পশ্চিমবঙ্গে এর আবেদন এখন পুরোপুরিভাবে অনলাইনে হয়, ফলে ভিড়, দালালচক্র বা অযাচিত খরচ এড়ানো যায়।

EWS সার্টিফিকেট পাওয়ার যোগ্যতা — কে আবেদন করতে পারবেন?

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী EWS সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক।

১. আবেদনকারী অবশ্যই General Category হতে হবে

SC, ST বা OBC ক্যাটাগরির কেউ এই সুবিধা পাবেন না। এটি শুধুমাত্র সাধারণ শ্রেণীর নাগরিকদের জন্য। আপনি যদি জেনারেল ক্যাটাগরি চাকরি-প্রার্থী হয়ে থাকেন এবং আর্থিকভাবে দুর্বল হন তাহলে আপনি অবশ্যই এই সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

২. পরিবারের বার্ষিক আয় ৮ লক্ষ টাকার কম হতে হবে

যদি পরিবারের মোট আয় ৮ লক্ষ টাকার বেশি হয়, তবে আবেদন বাতিল হবে। তবে আপনার পরিবারের আর্থিক ইনকাম যদি ৮ লক্ষ টাকার কম হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই আপনি এই সার্টিফিকেটের জন্য উপযুক্ত হবেন।

৩. কৃষিজমি ৫ একরের বেশি থাকা চলবে না

৫ একরের বেশি কৃষিজমি থাকলে আবেদনযোগ্যতা থাকবে না।

৪. পৌরসভা ও গ্রামীণ এলাকায় জমি মালিকানার সীমা

এলাকা সম্পত্তির পরিমাণ যোগ্যতা
পৌরসভা ১০০ বর্গগজের বেশি প্লট অযোগ্য
পৌরসভার বাইরে ২০০ বর্গগজের বেশি প্লট অযোগ্য
ফ্ল্যাট বা বাড়ি ১০০০ বর্গফুটের বেশি হলে অযোগ্য

সম্পত্তি সংক্রান্ত যেকোনো ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে।

অনলাইনে EWS সার্টিফিকেট আবেদন — ধাপে ধাপে নতুন নির্দেশিকা (২০২৫ আপডেট)

নিচে পুরো প্রক্রিয়াটি খুব সহজ ভাষায় দেওয়া হলো, যাতে প্রথমবার আবেদনকারীও সহজেই করতে পারেন—

ধাপ ১: অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

EWS সার্টিফিকেটের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল—
castcertificatewb.gov.in

এটি ছাড়া অন্য কোনো সাইটে আবেদন করা যাবে না। আপনারা পশ্চিমবঙ্গের এই অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনের মাধ্যমে নিজেরাই সমস্ত তথ্য জোগাড় করে আবেদন করতে পারবেন।

ধাপ ২: “Apply for EWS” অপশন সিলেক্ট করুন

হোমপেজে “Apply for EWS” দেখতে পাবেন। এখান থেকেই অনলাইন আবেদনপত্র শুরু হবে।

ধাপ ৩: State অথবা Central EWS নির্বাচন করুন

দুটি ধরণের EWS সার্টিফিকেট আছে—

  • State EWS Certificate (রাজ্যভিত্তিক নিয়োগ ও শিক্ষায় ব্যবহৃত)
  • Central EWS Certificate (UPSC, SSC, Railway, Central Govt Jobs–এ প্রয়োজন)

যেটি প্রয়োজন, সেটি নির্বাচন করতে হবে। এরপর আপনি আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করবেন।

ধাপ ৪: আপনার জেলা ও এলাকা নির্বাচন করুন

আবেদন করার সময় আপনার প্রয়োজনীয় তথ্য ও ব্যক্তিগত তথ্য এছাড়াও আপনার ঠিকানা এখানে দিতে হবে—

  • জেলা
  • মহকুমা
  • ব্লক
  • পৌরসভা বা গ্রামপঞ্চায়েত

ধাপ ৫: ব্যক্তিগত তথ্য দিন

যে তথ্যগুলো দিতে হবে—

  • আবেদনকারীর পূর্ণ নাম
  • বাবার নাম
  • জন্মতারিখ
  • লিঙ্গ
  • ধর্ম
  • জাতি (General)
  • মোবাইল নম্বর
  • ইমেল আইডি
  • আধার কার্ড নম্বর
  • ভোটার আইডি

সব তথ্য অবশ্যই সরকারি নথির সঙ্গে মিল থাকতে হবে।

ধাপ ৬: ঠিকানা আপলোড করুন

বর্তমান এবং স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে লিখতে হবে।
প্রয়োজন হলে ঠিকানার প্রমাণ যেমন—রেশন কার্ড / বিদ্যুৎ বিল / আধার—আপলোড করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে আপনার স্থায়ী ঠিকানা প্রমাণপত্রটি স্ক্যান করে রাখতে হবে।

ধাপ ৭: দুইজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির তথ্য যুক্ত করুন

এদের বলা হয় local reference persons
এরা সাধারণত—পঞ্চায়েত সদস্য, শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী, চেনা প্রতিবেশী তাদের নাম, ঠিকানা এবং মোবাইল নম্বর দিতে হবে।

ধাপ ৮: পাসপোর্ট সাইজ রঙিন ছবি আপলোড

ফটো অবশ্যই— রঙিন পরিষ্কার সাম্প্রতিক তোলা হতে হবে।

ধাপ ৯: পরিবারের আয়ের তথ্য দিন

এখানে আবেদন জানানোর আগে অবশ্যই BDO/SDO প্রদত্ত Income Certificate আপলোড করা বাধ্যতামূলক।

ধাপ ১০: সম্পত্তির বিবরণ দিন

জমির পরিমাণ, ফ্ল্যাটের আকার বা বাড়ির আয়তন—সব সত্যি সত্যি উল্লেখ করতে হবে।
নিয়মের বেশি হলে আবেদন বাতিল হবে।

ধাপ ১১: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করুন

PDF বা JPG ফরম্যাটে আপলোড করতে হবে—

  • আধার কার্ড
  • রেশন বা বসবাসের প্রমাণ
  • জন্মের প্রমাণ
  • বাবা–মায়ের ভোটার কার্ড
  • PAN কার্ড
  • জমির দলিল/পর্চা
  • সেলফ ডিক্লারেশন
  • আয় শংসাপত্র

ধাপ ১২: আবেদন সাবমিট ও ডাউনলোড করুন

সব তথ্য পূরণ করার পর Submit করুন।
সাথে সাথে—Application ফর্ম  ও Acknowledgement Slip ডাউনলোড হয়ে যাবে। এটি ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।

ধাপ ১৩: ব্লক/এসডিও অফিসে নথি জমা দিন

অনলাইনে আবেদন করলেও, অফলাইনে আপনার ব্লক অফিস বা মহকুমা শাসকের দপ্তরে জমা দিতে হবে—

  • আবেদনপত্র
  • ডকুমেন্টের জেরক্স

যাচাই সম্পন্ন হলে চূড়ান্তভাবে সার্টিফিকেট ইস্যু করা হবে।

EWS সার্টিফিকেট পেতে কত সময় লাগে?

১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়।
কিছু ক্ষেত্রে আরও আগে মিলতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আপনি আপনি যদি কোন ভুল তথ্য দিয়ে থাকেন তাহলে আপনার আবেদন পত্রটি বাতিল হয়ে যাবে।

বর্তমানে প্রায় সব সরকারি নিয়োগেই EWS কোটার সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সময়মতো EWS সার্টিফিকেট থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও সব থেকে বড় কথা হলো সমস্ত চাকরির ক্ষেত্রে এর ১০% সংরক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে।

এখন EWS সার্টিফিকেট পাওয়া আগের চেয়ে অনেক সহজ

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডিজিটাল পরিষেবার কারণে এখন সাধারণ নাগরিকেরা নিজেদের মোবাইল থেকেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে পারছেন। আর দালালচক্র, লাইনের ঝামেলা বা অতিরিক্ত খরচের ভয় নেই।

যদি আপনি General Category–এর অধীনে পড়েন এবং আয় ও সম্পত্তির শর্ত পূরণ করেন—
তাহলে আজই অনলাইনে আবেদন করুন আপনার EWS Certificate।