রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা আরও দ্রুত ও সহজে পৌঁছে দিতে বড় পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এবার আপনি ঘরে বসেই করতে পারবেন আবেদন এছাড়াও এবার একই ক্যাম্পে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সরাসরি আবেদন করার সুযোগ মিলছে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (সরকারি ছুটি বাদে) রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে বসতে চলেছে বিশেষ প্রশাসনিক শিবির। এই শিবিরে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী, খেতমজুরদের আর্থিক সহায়তা ও কৃষকদের জলকর মকুব— সহ একাধিক প্রকল্পে আবেদন নেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেকটি জনগণের জন্য কোনো না কোনো প্রকল্পের আবেদন চলছে এই ক্যাম্পে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনিক বৈঠকে আগেই ঘোষণা করেছিলেন, “সরকারি প্রকল্পে আবেদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে। মানুষকে বারবার দপ্তরে ঘুরতে হবে না।” সেই ঘোষণার বাস্তব রূপই এবার বিধানসভা ভিত্তিক এই ক্যাম্প। তাই দুয়ারে সরকার প্রকল্পের মত ক্যাম্প বসানো হয়েছে যেখানে আবেদন চলছে।।

কেন নেওয়া হল এই সিদ্ধান্ত?

গত কয়েক বছরে রাজ্যের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে বিপুল সংখ্যক মানুষ আবেদন করেছেন। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে—

  • আলাদা আলাদা দপ্তরে গিয়ে আবেদন করতে হচ্ছে এর ফলে প্রচুর সময় লেগে যাচ্ছে
  • নথি যাচাইয়ের জন্য একাধিকবার আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে
  • গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত খরচ বাড়ছে
  • অনলাইনে আবেদন করতে প্রযুক্তিগত সমস্যায় পড়ছেন অনেকে ফলে খুব দ্রুত আবেদন জমা পড়ে যাচ্ছে।

এই সমস্যাগুলির সমাধান করতেই প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে— একসঙ্গে একাধিক প্রকল্পে আবেদন নেওয়া হবে বিধানসভা স্তরে।

কোন কোন প্রকল্পে আবেদন করা যাবে?

এই বিশেষ ক্যাম্পে যে প্রকল্পগুলিতে আবেদন করা যাবে, তার মধ্যে প্রধান হল—  লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী, খেতমজুরদের বার্ষিক আর্থিক সহায়তা (₹৪,০০০), কৃষকদের সেচের জলকর মকুব।

প্রশাসনের দাবি, এই উদ্যোগের ফলে আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং উপভোক্তারা সময়মতো সুবিধা পাবেন।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার: বাড়ল অনুদান, বাড়ছে উপভোক্তা

রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। ২৫ বছর থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত মহিলারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। বর্তমানে প্রায় ২.৪২ কোটি মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন। সম্প্রতি আরও প্রায় ২০ লক্ষের বেশি নতুন আবেদনকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে

অনুদানের নতুন পরিমাণ কত?

সাম্প্রতিক বাজেট ঘোষণায় অনুদানের অঙ্ক বাড়ানো হয়েছে—

  • সাধারণ শ্রেণির মহিলারা আগে পেতেন ₹১,০০০ → এখন পাবেন ₹১,৫০০ প্রতি মাসে
  • এসসি/এসটি শ্রেণির মহিলারা আগে পেতেন ₹১,২০০ → এখন পাবেন ₹১,৭০০ প্রতি মাসে

এই বৃদ্ধি কার্যকর হওয়ার ফলে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির আর্থিক সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছে প্রশাসন। এছাড়াও বেকার যুবক-যুবতীরা ২১ বছর বয়স থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত পেয়ে যাবেন যুব সাথী ভাতা। যেখানেও ১৫০০ করে টাকা দেওয়া হবে।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে আবেদন করতে কী কী লাগবে?

আবেদনকারীদের সঙ্গে রাখতে হবে—

  • আধার কার্ড
  • জাতিগত শংসাপত্র (যদি প্রযোজ্য)
  • ব্যাঙ্ক পাসবইয়ের প্রথম পাতার জেরক্স
  • সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজ ছবি

ক্যাম্পে উপস্থিত আধিকারিকরা নথি যাচাই করে আবেদন গ্রহণ করবেন এবং প্রাথমিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।

যুবসাথী প্রকল্প: বেকার যুবকদের জন্য আর্থিক সহায়তা

রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সন্ধান চলাকালীন আর্থিক চাপ কমাতে চালু হয়েছে যুবসাথী প্রকল্প। এই প্রকল্পে যোগ্য বেকার যুবক-যুবতীদের মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

কারা আবেদন করতে পারবেন?

  • বয়স ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হতে হবে
  • মাধ্যমিক বা সমতুল্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে
  • আবেদনকারী স্থায়ী সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হতে পারবেন না
  • অন্য শিক্ষা সংক্রান্ত স্কলারশিপ পেলেও আবেদন করা যাবে

কত টাকা মিলবে?

যোগ্য প্রার্থীরা পাবেন—
মাসে ₹১,৫০০
সর্বাধিক ৫ বছর পর্যন্ত

এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধুমাত্র আর্থিক সহায়তা নয়, বরং কর্মসংস্থানের প্রস্তুতিকালীন একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করা।

যুবসাথীতে আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথি

  • আধার কার্ড
  • জাতিগত শংসাপত্র (যদি প্রযোজ্য)
  • ব্যাঙ্ক পাসবইয়ের প্রথম পাতার জেরক্স
  • মাধ্যমিক অ্যাডমিট কার্ডের জেরক্স
  • ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি

খেতমজুর ও কৃষকদের জন্য কী সুবিধা?

এই ক্যাম্পে খেতমজুরদের জন্য বার্ষিক ₹৪,০০০ আর্থিক সহায়তার আবেদন নেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষকদের সেচের জলের নির্ধারিত জলকর মকুব সংক্রান্ত আবেদনও জমা দেওয়া যাবে।

গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে এই সুবিধাগুলি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

আবেদন প্রক্রিয়া কীভাবে হবে?

১. নির্দিষ্ট বিধানসভা এলাকার ক্যাম্পে উপস্থিত হতে হবে
২. প্রয়োজনীয় নথির মূল কপি ও জেরক্স সঙ্গে রাখতে হবে
৩. ফর্ম পূরণ করে জমা দিতে হবে
৪. সেখানেই প্রাথমিক যাচাই সম্পন্ন হবে
৫. অনুমোদনের পর সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানো হবে

আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ

✔ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সক্রিয় আছে কি না যাচাই করুন
✔ আধার ও ব্যাঙ্ক তথ্য মিল আছে কি না দেখুন
✔ মোবাইল নম্বর আধারের সঙ্গে সংযুক্ত আছে কি না নিশ্চিত করুন
✔ অসম্পূর্ণ নথি নিয়ে গেলে আবেদন বাতিল হতে পারে

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও যুবসাথী— দুটি বড় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে এবার একসঙ্গে আবেদন করার সুযোগ এনে দিল রাজ্য সরকার। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিধানসভা ভিত্তিক ক্যাম্প সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

যারা এখনও আবেদন করেননি, তাদের জন্য এটি বড় সুযোগ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে ক্যাম্পে গিয়ে আবেদন করলে মিলতে পারে মাসিক আর্থিক সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা।